র্সবশেষ শিরোনাম

বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ২০, ২০১৮

বাংলা পত্রিকা

Main Menu

সপ্তাহের শুরুতে সম্পূর্ণ নতুন সংবাদ নিয়ে

ইতিহাসের চরণ ছুঁয়ে যাই-১

লন্ডনের বাঙ্গালীপাড়া ব্রিকলেন

হাবিবুর রহমান: ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেন থেকে লন্ডনের উদ্দেশ্যে আমার ফ্লাইট ছিলো খুব সকালে। সেন্ট্রাল রেল স্টেশনের গা ঘেঁষে আমার হোটেল। হাঁটা পথে ৫ মিনিটেরও কম। ট্যাক্সি লাগার কথা নয়। কিন্তু রুমছেড়ে বেরোতেই দেখলাম অঝোড় ধারায় বৃষ্টি পড়ছে। রিসিপসান থেকে জানালো এই বৃষ্টি ভেজা ভোর রাতে এত কাছের ডেস্টিনেশনের জন্য ট্যাক্সি পাওয়া যাবে না। অগ্যতা বৃষ্টি একটু কমলে দ্রুত হেঁটে রেল স্টেশন এবং পরে সেখান থেকে বাসে কোপেন হেগেন এয়ারপোর্ট।

ইউরোপে কিছু ব্যাপার আমার খুবই পছন্দের। যেমন প্রতিটা বিমান বন্দর থেকে সিটিতে যাবার জন্য ট্রেন এবং বাসের সু ব্যবস্থা। সময় লাগে কম এবং খরচ সাশ্রয়ী। বিমান বন্দরের ভেতরেই ইনফরমেশন সেন্টার। কোথায় যাবেন বললে সঠিক রেল স্টেশন অথবা বাস স্টপেজটা বলে দেবে। টিকিট কখনো কখনো ওসব কাউন্টারেই পাওয়া যায়। অথবা টিকিট কাউন্টারে হেল্প করার জন্য নির্দিষ্ট লোক নিয়োজিত আছে। প্রায় দেশেই একই টিকিটে ট্রেন অথবা বাসে ভ্রমণ করার সুযোগ রয়েছে।
যাই হোক নরওয়েজিয়ান এয়ারলাইনে সঠিক সময়ে লন্ডন গেট উইক বিমান বন্দরে অবতরণ করলাম। এবার আমার হোটেল ছিলো বিমান বন্দরের পাশেই কোটইয়ার্ড ম্যারিয়ট। সাউথ টার্মিনাল থেকে বেরিয়েই হাঁটা পথে ৫ মিনিটের রাস্তা। আবার বেরোবার গেট থেকে প্রতি ১৫ মিনিট পর পর বাস এসে নামিয়ে দিচ্ছে হোটেলে হোটেলে। ভাড়া নিচ্ছে ৩ পাউন্ড করে। একদম ভীড় নেই। তাই আমি লাগেজ নিয়ে টানাটানি না করে বাসেই হোটেলে চলে এলাম।

ব্রিকলেনের পাশে ইস্ট লন্ডন জামে মসজিদ।

সাধারণত হোটেল গুলোতে চেকইন হয় বিকাল তিনটায়। অনেক হোটেলেই রুম খালি থাকলেও দিতে চায় না। এবারের ভ্রমণেও পর্তুগালে আমার এমনটি হয়েছিলো। নিউইয়র্ক থেকে পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে পৌছি ভোর পাঁচটায়। তারপর বিমান বন্দরের বাইরে থেকে বাস আমাদের নামিয়ে দিলো একেবারেই হোটেলের দোড় গোড়ায়। কিন্তু হোটেল থেকে জানানো হলো তিনটার আগে আমাদের রুম দেয়া সম্ভব নয়। অগত্যা লাগেজ তাদের জিম্মায় রেখে শহরে গিয়ে এলো মেলো সময় কাটিয়ে দু’টোর দিকে এসে রুম পাওয়া গেলো।
লন্ডন গেট উইক এয়ারপোর্টের ম্যারিয়ট হোটেলটি সুবিশাল। ২১৮টি গেস্ট রুম। তাই অতি সকালেও রুম পেতে বেগ হলোনা। রুমে এসে হাত মুখ ধুয়ে হোটেলেই ব্রেকফাস্ট সেরে আবার এয়ারপোর্ট রেলস্টেশন। গেট উইক এয়ারপোর্ট থেকে এক্সপ্রেসে এবং লোকাল দু ধরনের ট্রেন যায় সেন্ট্রাল লন্ডনের ভিক্টোরিয়া রেল স্টেশনে। বাসও আছে। প্রতিদিন ২২৮টি এক্সপ্রেস ট্রেন যাতায়াত করে উভয় গন্তব্যে। এক্সপ্রেস ট্রেনে সময় নেয় ২৯ মিনিট এবং ভাড়া ১৯.৯০ পাউন্ড। সময় বাঁচানোর জন্য এক্সপ্রেস ট্রেনেই পৌঁছলাম ভিক্টোরিয়া রেল স্টেশনে।

ব্রিকলেনের স্বাদ রেষ্টুরেন্ট

বিশাল বড় স্টেশন এই ভিক্টোরিয়া। বৃটিশ ঐতিহ্যের ছাপ স্টেশনের নির্মান শৈলীতে। রানী ভিক্টোরিয়ার মুর্তি খচিত রেল স্টেশন ভবনটি ১৮৫৮ সালের ২৭ মার্চ নির্মান করা হয়। এটি লন্ডনের দ্বিতীয় বৃহত্তম রেলস্টেশন। এখান থেকে বৃটেনের যেকোন শহরে যাওয়ার সরাসরি ট্রেন পাওয়া যায়। ১৯টি প্লাটফর্ম রয়েছে এই স্টেশনে। এক পরিসংখ্যানে দেখা যায় ২০১৫-১৬ সালে ৮১ মিলিয়ন যাত্রী এই স্টেশনে উঠানামা করেছে।
পরদিন আমার দিনব্যাপি গাইডেড ট্যুর বুক করা আছে। তাই আজ ফ্রি টাইমে নিজের মত করে লন্ডন শহরটা ঘুরবো বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তালিকায় প্রথমেই রেখেছি লন্ডনের বাঙ্গালী পাড়া ব্রিকলেন। ট্রেনেই যাওয়া যেতো। কিন্তু সময় বাঁচাতে একটা ট্যাক্সি নিয়ে দ্রুত পৌছে গেলাম ওখানে।
ঘোরাঘুরির শুরুতে একটা বাংলাদেশী হোটেল থেকে ঢুকে পড়লাম দুপুরের খাবার খেতে।
নাম তৃপ্তি হোটেল। প্রায় ১০দিন ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ঘোরা ঘুরির পর তৃপ্তি হোটেলে তৃপ্তি করে খেলাম। সাদা চিকন চালের ভাত, মুরগীর মাংস, ঘন ডাল, খুব যত্ম করে সালাদ বানিয়ে আনলেন একজন সিলেটি আপা। হোটেলটা খুবই পরিস্কার পরিচ্ছন্ন। শেষে আয়েশ করে এক কাপ চা।
এই কদিনে ইউরোপের অন্যান্য দেশ চা বা কফি খেয়ে তৃপ্তি পাইনি। ছোট কাপে কড়া কফি। ওরা দুধ ছাড়া কফি খায়। অবশ্য খেতে চাইলে দুধের ব্যবস্থা আছে। চায়ের কাপের হাতলে আঙ্গুল ঢোকেনা। সব মিশিয়েই তো তৃপ্তি। তাই লন্ডনের বাঙ্গালী পাড়ায় ভাতের পর তৃপ্তির সাথে চা খেয়ে বেরোলাম বাঙ্গালী পাড়া ঘুরে দেখার জন্য।

গ্রাম বাংলা রেষ্টুরেন্ট

বৃটেনে বাংলাদেশী সন্তানদের বুকে ধারণ করে আছে এই ব্রিকলেন। জানা যায় এখানে বসবাসরত সাদা চামড়ার আদি মানুষগুলো বাদামী চামড়ার বাংলাদেশীদের প্রবেশাধিকার সহজে মেনে নিতে চায়নি। কঠিন বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়ে নিজেদের অবস্থান পাকা পোক্ত করেছেন এখানে বাংলাদেশীরা। তারা বর্ণবাদের মুখোমুখি হয়েছেন। ছিনতাই, মারামারি কিছুই বাদ যায়নি। ১৯৭৮ সালে বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলনে নিহত হন বাংলাদেশী আলতাব আলী। তার স্মরণে ব্রিকলেনের সদর রাস্তার ঠিক পাশেই গড়ে তোলা হয়েছে শহীদ আলতাব আলী পার্ক। আর এই পার্কের এক কোণায় দাঁড়িয়ে আছে বাঙ্গালরি গৌরবের প্রতীক শহীদ মিনার।
ব্রিকলেনের রাস্তার দু’পাশ ঘিরেই বাঙ্গালীদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। রেস্টুরেন্ট, গ্রোসারী, ট্রাভেল এজেন্সী, ক্যাসেটের দোকান, শাড়ীর দোকান, ধর্মীয় বই ও পত্রিকা, সুপারস্টোর কি নেই ওখানে। হাঁটতে গেলে মনেই হয়না দেশের বাইরে কোথাও আছি। স্বাদ রেস্টুরেন্ট, আমাদের গাঁও, গ্রাম বাংলা, আলাউদ্দিন সুইটস, তাজ স্টোরস, সোনারগাঁও বাংলাদেশী ইন্ডিয়ান কুইজিন, মাছ বাজার- প্রতিষ্ঠানের এসব নামগুলো প্রবাসে নিজের দেশটাকেই মনে করিয়ে দেয়।

ব্রিকলেনের রাস্তায় লেখক

বাংলাদেশের সব কিছুই এখানে পাওয়া যায়। কচুর লতি থেকে শুরু করে পালংশাক, নাগা মরিচ, সাতকড়া, বাবা জর্দা, ছোট বড় সব ধরনের মাছ। এই ব্রিকলেনের আরো একটা পরিচয় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ছড়িয়ে আছে। তাহলো ব্রিকলেন মানে কারী ক্যাপিটাল। রান্নার রাজধানী। এখানে প্রতিবছর কারী ফেস্টিভ্যাল হয়। ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে হাজার হাজার লোক এসে এই কারী ফেস্টিভ্যালে যোগ দেন। ব্রিকলেনের এই বাংলাদেশী রেস্টুরেন্ট গুলোর সুনাম এখন সারা ইউরোপ জুড়ে।
ব্রিকলেনের আরো একটি ঘটনা বিদেশে বাঙ্গালীদের মনে রাখার মত। তাহলো এখানকার বৈশাখী মেলা যা গোটা ইউরোপের দ্বিতীয় বৃহত্তম মেলার মর্যাদা পেয়েছে।
আমাকে আবার সাউথ লন্ডনে হোটেলে ফিরে যেতে হবে। তাই ব্রিকলেনের কারী ক্যাপিটাল থেকে বেরিয়ে রওয়ানা হলাম ইষ্ট লন্ডনের বাঙ্গালীদের বড় মসজিদটি দেখতে। অল্প দূরত্বেই এই নান্দনিক মসজিদ। তখন মাগরিবের নামাজ শেষ হয়েছে। নামাজ পড়ে প্রচুর বাংলাদেশী বেরিয়ে আসছেন। তাদের কথা বার্তায় রাস্তা ঘাট মুখরিত। মসজিদের সামনে বহু বাংলাদেশী ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। রাস্তার পাশের ফুটপাতে হকার জাতীয় দোকান যার পুরোটাই বাংলাদেশীদের নিয়ন্ত্রিত।
বর্ণবাদের হিং¯্র থাবাকে মোকাবেলা করে আল শহীদ আলতাব আলীর রক্তের বিনিময়ে আজ ব্রিকলেন প্রবাসে বাঙ্গালীদের সগর্ব অস্তিত্ব ঘোষণা করেছে। দেশের বাইরে একদল দেশ প্রেমিক পরম মমতায় নিজেদের রক্তের বিনিময়ে এখানে নিজেদের অস্তিত্বের খুঁটিটি মাটির গভীরে প্রোথিত করে দিয়েছেন। তাদের শ্রদ্ধা জানিয়ে আমি রওয়ানা হলাম দক্ষিণ লন্ডনে আমার অস্থায়ী আবাস স্থল ম্যারিয়ট হোটেলের দিকে।

হাবিবুর রহমান
সাংবাদিক, প্রধান নির্বাহী, বাংলা ট্যুর
ই-মেইল: banglatourus@gmail.com

এ রকম আরো খবর

বাংলা ট্যুরে ভিড়ছে আমেরিকানরা

নিউইয়র্ক: একদল আমেরিকান ট্যুরিস্ট নিয়ে ইউরোপের ৫টি দেশ ঘুরে এলোবিস্তারিত

বাংলা ট্যুর গ্রুপ ঘুরে এলো কানাডা

নিউইয়র্কে বাংলাদেশী পরিচালিত একমাত্র গাইডেড ট্যুর প্রতিষ্ঠান বাংলা ট্যুরের একটিবিস্তারিত

  • ঘুরে আসুন রকফেলার সেন্টার
  • আইফেল সুন্দরী প্যারিস
  • error: Content is protected !! Please don\'t try to copy.